আ.লীগে শাহীন চাকলাদার জনপ্রিয়তার শীর্ষে, বিএনপির ভরসা তরিকুলই!

বছরের শেষপ্রান্তে জাতীয় নির্বাচন। এরই মধ্যে সারা দেশে বইছে ভোটের হাওয়া। দলগুলোতে প্রস্তুতির তোড়জোড়। সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ তুঙ্গে। নির্বাচনী এলাকায় ঘন ঘন ছুটছেন বিভিন্ন দলের হেভিওয়েট নেতারাও। কেমন তাদের প্রস্তুতি, মাঠের অবস্থাইবা কি? এ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন।

ডেস্ক নিউজ : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে যশোর জেলার সংসদীয় ৬টি আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান জানান দিয়ে নানা কৌশলে এগিয়ে চলেছেন। নির্বাচনী এলাকা ঘুরে স্থানীয় জনগণ ও রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা বলে জানা যায়, যশোর-৩ আসনে জেলা আওয়ামী লীগের পরপর দুই দফা সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদার জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছেন। তিনিই দলের হেভিওয়েট প্রার্থী বলে খ্যাত। বিশেষ করে দলের তরুণ আর উদীয়মান নেতাদের কাছে শাহীন চাকলাদার হয়ে উঠেছেন এক অনুকরণীয় নেতা। তাকে লড়াই করতে হয়েছে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা তরিকুল ইসলাম ও জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে। অপরদিকে বর্তমানে যশোর-৩ (সদর) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ ব্যবসায়িক কারণে অধিকাংশ সময় যশোরের বাইরে অবস্থান করেন। ফলে প্রয়োজনে তাকে পাওয়া যায় না। এমনকি ফোন করলেও তার ম্যানেজার বা এপিএসরা রিসিভ করেন। তাদের কাছে অনুরোধ জানিয়েও অধিকাংশ নেতার কথা বলার সুযোগ মেলে না। এ জন্য কাজী নাবিল আহমেদ সংসদ সদস্য হয়েও তৃণমূলে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

অন্যদিকে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম বরাবরই এ আসন থেকে নির্বাচন করে থাকেন। বর্ষীয়ান এই নেতা শুধু যশোর নয়, খুলনা বিভাগে তাকে বিএনপির কাণ্ডারি মনে করে থাকেন দলের নেতাকর্মীরা। ফলে তরিকুল ইসলাম এবারো নির্বাচনে অংশ নেবেন মনে করছেন দলের নেতাকর্মীরা। ফলে এ আসন থেকে বিএনপির আর কেউ দলীয় টিকেট চাইবেন না। তবে সম্প্রতি তার শারীরিক অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। অন্যান্য রোগ বাদ দিলেও কিডনিজনিত জটিলতায় তিনি কাহিল হয়ে পড়েছেন। সপ্তাহে কয়েকবার ডায়ালিসিস নিতে হচ্ছে তাকে। এ কারণে দলীয় কর্মকাণ্ডে কাক্সিক্ষত সময় দিতে পারছেন না। তিনি যদি অসুস্থতা কাটিয়ে উঠতে না পারেন তবে এ আসনে নতুন মুখের ছড়াছড়ি হতে পারে।

শাহীন চাকলাদার সর্ব প্রথম ২০০৪ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে যশোরের প্রভাবশালী নেতা শরিফ আব্দুর রাকিবকে হটিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। দায়িত্ব পেয়েই নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তৎকালীন জোট সরকার বিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে নেতাকর্মীদের আস্থা অর্জন করেন। পরে নির্বাচিত হন যশোর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে উন্নয়নে ভূমিকার সর্বশেষ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন। ২০১৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে তাকে পুনরায় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়।

যশোর জেলা ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বিপুল বলেন, নির্বাচন ঠেকানোর নামে সারা দেশে বিএনপি-জামায়াত জোট যখন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তখন যশোরেও তার প্রভাব পড়ে। শাহীন চাকলাদারের দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে সে দিন যশোরে বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা সাধারণ মানুষের তেমন কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। তার নির্দেশনা মেনে রাজপথে থেকে আমরা তাদের সব অপচেষ্টা ব্যর্থ করেছি। এর আগে ওয়ান ইলেভেনের সময়ও নেতৃত্বের সাহসিকতার পরিচয় দেন শাহীন চাকলাদার। এ সময় জেলার অধিকাংশ শীর্ষ নেতা আত্মগোপনে থাকলেও শাহীন চাকলাদার আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচি পালন করেন। তৃণমূলের নেতাকর্মীর সঙ্গে তার রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। সুতরাং নানা কারণেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে শাহীন চাকলাদারের বিকল্প নেই।

শাহীন চাকলাদারের বিষয়ে কয়েকজন ব্যবসায়ী, দিনমজুর লোকের সঙ্গে আলাপ করলে তারা নিজেদের নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, যশোরে যেহেতু বিএনপির প্রভাবশালী নেতা জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম নির্বাচন করবেন। সেহেতু বিজয়ী হতে হলে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে আওয়ামী লীগে শাহীন চাকলাদার বিকল্প ভাবার অবকাশ নেই।

শাহীন চাকলাদার পক্ষের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দলীয় নেতাকর্মীদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে সংসদ সদস্য ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছেন। আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি দীর্ঘদিন পর যশোরে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। এ জন্য অর্থের বিনিময়ে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদলের কর্মীদের কাছে টেনেছেন। তাদের মাসিক বেতন দিয়ে রাজনীতি করাচ্ছেন। অন্যদিকে শাহীন চাকলাদার স্থায়ীভাবে যশোরে বসবাস করেন। তিনি বিভিন্ন দলীয় ও জাতীয় দিবসে দলীয় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সব ধরনের কর্মসূচি সফলভাবে পালন করেন। যদিও তৃণমূলসহ দলের বাইরে থাকা বর্তমান এমপি কাজী নাবেল আহম্মেদ ও সাবেক এমপি খালেদুর রহমান টিটোও যশোর-৩ সদর আসন থেকে মনোনোয়ন চাইতে পারেন।

এদিকে বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলাম জাতীয় রাজনীতিতে একজন প্রথম সারির নেতা। তিনি ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারম্যানসহ কয়েকবার যশোর-৩ সদর নির্বাচনী এলাকা জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া তিনি জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিএনপি সরকারে থাকাকালে বিভিন্ন সময়ে তরিকুল ইসলাম সমাজকল্যাণ ও মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্বের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন। বর্তমানে কিডনিজনিত জটিলতায় ভুগছেন। এ বিষয়ে দলটির নেতারা বলছেন, তরিকুল ইসলামের নির্বাচন করার মতো শারীরিক সক্ষমতা থাকলে এ আসনের জন্য অন্য কেউ মনোনয়ন চাইবেন না। আর যদি নির্বাচন করতে অপারগতা প্রকাশ করেন, তাহলে অন্তত তিন নেতা এই আসনে বিএনপির টিকেট চাইবেন। এরা হলেন- তরিকুল ইসলামের ছেলে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, তরিকুল ইসলামের ভাতিজা যশোর নগর বিএনপির সভাপতি মারুফুল ইসলাম মারুফ এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট সাবেরুল হক সাবু। এ বিষয়ে তরিকুল ইসলাম বলেন, কমবেশি শারীরিক অসুস্থতার মধ্যে রয়েছি। তবে ইঙ্গিত করে বলেন, শারীরিক অবস্থা ভালো থাকলে এবারের মতো সংসদ নির্বাচন প্রার্থী হিসেবে থাকবেন।

যশোর সদর আসনে আওয়ামী লীগের শাহীন চাকলাদার ও বিএনপির তরিকুল ইসলাম আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলে এ আসনে প্রতিদ্ব›িদ্বতামূলক নির্বাচন হবে বলে অভিমত পোষণ করেছেন স্থানীয় সাধারণ ভোটাররা।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও মনোনোয়ন প্রসঙ্গে শাহীন চাকলাদার বলেন, আদর্শের সঙ্গে আমার কোন বেইমানি নেই। আমি তৃণমূলের নেতাকর্মী-সমর্থকদের অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের সঙ্গে নিয়ে রাজনীতিতে আছি। ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের পরাজয়ে পর থেকে হাল ধরেছি। দলের চরম দুর্দিনে যশোরে দায়িত্ব থাকা নেতাকর্মীরা গা ঢাকা দিলেও আমি সভা-সমাবেশ করতে সক্ষম হয়েছি। তা সফলও করেছি। ২০০২ সালে সভানেত্রী শেখ হাসিনার সাংগাঠনিক সফর যখন খুলনা বিভাগে আসেন আমি তখন পথসভাকে জনসভায় রূপ দিয়েছি। বিএনপি সরকার তখন আমার নেত্রীকে কোনো প্রটোকল দেননি। আমি নিজে প্রায় ৩০ গাড়ি লোক নিয়ে নেত্রীর বহরে থেকেছি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যারা ধারণ করেন তারা সবাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার পক্ষে। তিনি আরো বলেন, যেহেতু দলীয় সভানেত্রী বলেছেন, যে নেতা তৃণমূলসহ সাধারণ জনগণের আস্থাভাজন ও জনপ্রিয় তাকেই আগামী সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনোয়ন দেবেন। যেহেতু আমার সঙ্গে দলের তৃণমূলসহ সাধারণ জনগণের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে সেহেতু আমার বিষয়টা অবশ্যই তিনি বিবেচনা করবেন। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনোয়নে সভানেত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সূত্র: দৈনিক ভোরের কাগজ।