ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ৬০ শতাংশ শিবির! প্রবেশ করেছ জাকিরের হাত ধরে।

মানষ জ্যোতি রায়:    বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রামে ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। ষাটের দশকে গড়ে ওঠা বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিসংগ্রামে গৌরবজনক ভূমিকা রয়েছে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও রাজপথে লড়াকু ছিলেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে ততই ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে নানা অপকর্মের অভিযোগ উঠেছে। নানা সময়ে সংগঠনটির নেতৃত্ব এসব অপকর্মের পেছনে সংগঠনে অনুপ্রবেশকারীদের দায়ী করেছেন। সর্বশেষ কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিবির থেকে ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশকারীরা তাণ্ডব চালিয়েছে এমনকি তারাই সেই আন্দোলনে উসকানি দিয়ে নেতৃত্বও দিয়েছেন বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে।

এ প্রতিনিধির সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন মাঠ পর্যায়ের সঙ্গে কয়েকদিন নিয়মিত এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে, তারা নিশ্চিত করেছেন যে ছাত্রলীগের মধ্যে ৬০ শতাংশ শিবির অনুপ্রবেশ হয়েছে মেয়াদোর্ত্তীণ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক  এস এম জাকির হোসাইনের হাত ধরে। কমপক্ষে ৩৬ জন কেন্দ্রীয় নেতা আগে শিবির ও ছাত্রদলের সরাসরি রাজনীতি করতো বলেও নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটির ১ জন সহ-সভাপতি, ১ জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ১ জন সাংগঠনিক সম্পাদক রয়েছেন। এছাড়া কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়াও বিভিন্ন জেলা কমিটির শীর্ষ পদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের পদে শিবির নেতাদের ছাত্রলীগের পদে বসানো হয়েছে।  তাদের মূল পৃষ্ঠপোষক এস এম জাকির হোসাইন। যার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে কলেজ জীবনে ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকারও অভিযোগ রয়েছে।

এরপরও ছাত্রলীগে বেপোরোয়াভাবে শিবির  অনুপ্রবেশ করেছে, কিন্তু সাইফুর রহমান সোহাগ এবং এস এম জাকির হোসাইনের কমিটি কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি, এ নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। সর্বশেষ ঢাবির এফ রহমান হলের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তুষারকে পদে বসানো হয়। তিনি সরাসরি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইনের অনুসারী বলে জানা গেছে। এই তুষার চট্টগ্রাম কলেজ শাখা ইসলামী ছাত্র শিবিরের সহ-সম্পাদক ছিলেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এসব বিষয়ে কথা বলতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ছাত্রলীগে আগে অনুপ্রবেশকারী ছিল কি না জানি না, তবে এখন কোনো অনুপ্রবেশকারী নেই।’ তৃণমূলের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, স্থানীয় এমপি, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, এমনকি ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপের আশ্রয়ে সংগঠনে অনুপ্রবেশকারীরা প্রভাবশালী হয়েছেন।

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা চালিয়ে যেতে শিবিরের অনেক নেতাকর্মীই ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। আর ছাত্রলীগে বিভিন্ন গ্রুপ-উপগ্রুপ থাকায় দল ভারী করতে অনেক নেতাই তাদের সুযোগ দিচ্ছেন। ফলে ত্যাগী নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হচ্ছেন, আবার অনেক কমিটিতেই ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের পদ দেওয়ার অভিযোগও নতুন নয়। তবে ভিন্ন চিত্রও রয়েছে। প্রতিপক্ষ গ্রুপকে ফাঁসাতে অনেক সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদেরও শিবিরকর্মী সাজানোর চেষ্টা চলে বলেও জানিয়েছেন কয়েকজন নেতা।

দেশব্যাপী সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, ছাত্রলীগের আগামী সম্মেলনে শীর্ষ পদপ্রত্যাশী জবি ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের কার্যালয় থেকে শিবির ক্যাডার কাউছার নিয়াজ সাইমুনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। সাইমুন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সর্বশেষ সম্মেলনে কাউন্সিলর ছিলেন। তাকে আটকের পর চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সদ্য অব্যাহতি পাওয়া সাধারণ সম্পাদক নূরুল আজিম রনি বলেছিলেন, ‘শুধু সাইমুন নয়, সারা দেশে ছাত্রলীগে এ রকম অসংখ্য শিবিরের স্পাই রয়েছে।’ এছাড়াও চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজ ছাত্রলীগের নেতারা এম কায়সার নামের এক ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে শিবিরসম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে চট্টগ্রামে বিক্ষোভ করেন।

এক সময়ে ছাত্রশিবিরের দুর্গ বলে পরিচিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কমিটিতে শিবির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সংবাদ সম্মেলন করে মনিটরিং টিম গঠন করার ঘোষণা দিয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। ওই শাখার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাশেদুল ইসলাম রাঞ্জু বলেছিলেন, শিবিরমুক্ত রাবি ছাত্রলীগ গড়তে একটি মনিটরিং টিম গঠন করা হবে। ওই কমিটি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করবে। তাদের যৌক্তিক ও প্রমাণিত অভিযোগের ভিত্তিতে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাবি ছাত্রলীগে শিবিরের কোনো জায়গা হবে না। কিন্তু পরবর্তীতে গঠন করা রাবির হল কমিটিগুলোতে শিবিরের একাধিক নেতাকর্মী স্থান পান বলে অভিযোগ ওঠে। একই অভিযোগ ওঠে শাবিপ্রবি ছাত্রলীগের কমিটি গঠনেও।

ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় এমপিরাও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে অভিযোগ করেছেন। এর মধ্যে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মামুনের বিরুদ্ধে শিবিরের ক্যাডার ছিলেন বলে অভিযোগ এনে স্থানীয় এমপি ডা. এম আমানউল্লাহ প্রধানমন্ত্রী ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন, যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

এদিকে ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশকারীদের উৎপাত নতুন কিছু নয়। এর আগে ২০১০ সালেও দলের কার্যনির্বাহী সভায় ছাত্রলীগের কোনো কোনো কমিটিতে শিবিরকর্মী ঢুকেছে, কারা ঢুকিয়েছে তা তদন্ত করে তার তালিকা তৈরি করতে বলেছিলেন আওয়ামী লীগপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তখন ছাত্রলীগ নেতাদের সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বলতেন, খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশ একটি উর্বর দেশ। কিন্তু খাদ্যশস্যের সঙ্গে সঙ্গে আগাছাও জন্মায়। তাই ভালো শস্য উৎপাদনের জন্য আগাছা তুলে ফেলতে হবে।’

ছাত্রলীগে কিভাবে আপনার হাত ধরে এত এত ছাত্র শিবির অনুপ্রবেশ করলো গত ২ দিন ধরে ৩ বার এ প্রতিবেদক বিভিন্ন সময় ফোন করলেও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন কোনো ফোন ধরেননি। এমনকি পরবর্তীতে ফোন ব্যাকও করেননি।