ভারী বর্ষণে তলিয়ে গেছে বন্দরনগরী- ফের পাহাড় ধস

রাঙ্গামাটিতে সড়কে পাহাড় ধস : ছয় ঘণ্টা একটানা ভারী বর্ষণে তলিয়ে গেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা। গতকাল সোমবার একই দিনে চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি সড়কের বিভিন্নস্থানে পাহাড় ধস হয়েছে। পাহাড় ধসে চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

রাঙ্গামাটি জেলা প্রতিনিধি: মাত্র ছয় ঘণ্টার বৃষ্টিতে আবারো বুক সমান পানিতে ডুবে গেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। গতকাল সকাল নয়টা থেকে বিকাল তিনটা পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে নগরীর বেশিরভাগ এলাকা ডুবে গেছে। সড়ক ও রাজপথ, বাড়ি-ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অলি-গলিতে পানি। পানির স্রোতে খালে পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নগরীতে পাহাড় ধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা বিশ্বজিত্ চৌধুরী জানিয়েছেন, গতকাল সোমবার বিকাল তিনটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সর্বমোট ১৪৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। সকাল নয়টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড করা হয়েছিল মাত্র ৩৭ মিলিমিটার। অর্থাত্ গতকাল সকাল ৯টা থেকে বিকাল তিনটা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টায় ১০৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। আর রবিবার থেকে সোমবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এর সাথে গতকাল বিকাল তিনটার পর জোয়ারের পানি যোগ হয়ে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে বন্দরনগরীর মুরাদপুর চকবাজার, কাতালগঞ্জ, কার্পাসগোলা, বাদুরতলা, বহদ্দারহাট, চান্দগাঁও, খাজা রোড, মিয়াখান নগর, ষোলশহর, দুই নম্বর গেট, প্রবর্তক, মেহেদিবাগ, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, সিডিএ আবাসিক গোসাইলডাঙ্গা, হালিশহরের পুরো এলাকাই পানির নিচে। এছাড়া অপেক্ষাকৃত উঁচু অনেক এলাকায়ও পানি জমে যায়।

এসব এলাকায় যারা ঘরের বাইরে গেছেন তাদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। সড়কে যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্নস্থানে গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। যেসব এলাকায় গাড়ি চলেছে সেসব এলাকায় ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। স্কুল-কলেজ ও অফিসগামী মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। পাশাপাশি বাসাবাড়িতে পানি উঠে যাওয়ায় অনেকের রান্নার চুলা জ্বলেনি। এতে আহার ছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ করা সম্ভব হয়নি। দুই নং গেট এলাকার বাসিন্দা সাদ্দুর রহমান ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, অবস্থা ভয়াবহ। একদিনের বৃষ্টিতে এভাবে পানি উঠে গেলে মানুষ কীভাবে ঘর থেকে বের হবে। আগ্রাবাদে অফিসে যাওয়ার জন্য বের হয়েছিলাম। মাঝপথ থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছি।

রবিবার রাতে নগরীর দামপাড়া এলাকায় আত্মীয়ের বিয়ের দাওয়াতে গিয়ে শীলব্রত বড়ুয়া নামে এক বৃদ্ধ স্রোতে তলিয়ে যান। তিনি রয়েল গার্ডেন কমিউনিটি সেন্টার থেকে পার্শ্ববর্তী সড়কে গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন। গতকাল সোমবার সকাল ১১টার দিকে চাক্তাই খালে তার লাশ ভেসে উঠলে পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করেন।

প্রবল বর্ষণের কারণে রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং বিভিন্ন সড়ক কোমর পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ওয়াসা থেকে বহদ্দারহাট হয়ে আরাকান সড়ক এবং কর্ণফুলী সেতু সড়কে গতকাল শত শত যানবাহন আটকা পড়ে দীর্ঘ প্রায় ১০ ঘণ্টা অসহনীয় যানজটের সৃষ্টি হয়। মেহেদীবাগ, মুরাদপুর, আগ্রাবাদ কমার্স কলেজ এলাকা, যাদুঘর এলাকা, চৌমুহনী রঙ্গীপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, সিডিএ আবাসিক এলাকা, হালিশহর এক্সেস রোড, হালিশহর বি-ব্লক, বাকলিয়া, কাতালগঞ্জ, বহদ্দারহাট খাজা রোড, চমেক হাসপাতালের আশপাশ এলাকা, প্রবর্ত্তক মোড় হাঁটু থেকে কোমর পানির স্রোতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।

আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা রেজাউল হোসেন টিপু ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাদের অবস্থা মানবেতর পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। রমজান মাসে দুই দফা এবং ঈদের পর সোমবার আরেক দফা পানির তাণ্ডবে এখানকার কয়েক লক্ষ লোক গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে। এমনিতেই এই এলাকায় জোয়ারের পানি প্রতিদিন দুইবার আসা-যাওয়া করছে। তার ওপর গতকাল প্রবল বর্ষণে পুরো এলাকা কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার কোনো ভবনের নিচতলা ভাড়া হচ্ছে না। তার ওপর জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় কয়েকশ ভবনের দোতলা থেকে উপরের ফ্ল্যাটে শত শত পরিবার এই এলাকা ছেড়ে নগরীর অন্যত্র চলে যেতে শুরু করেছে।’

বর্ষণ অব্যাহত থাকায় কর্নফুলী নদী টইটম্বুর হয়ে। সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকায় বাড়তে থাকে বৃষ্টির পানি। দুপুরে বৃষ্টি বেড়ে গেলে তলিয়ে যেতে থাকে নগরীর নিচু এলাকাগুলো। প্রবল বর্ষণে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয় নগরীর আগ্রাবাদ এলাকা।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে গত রবিবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘন্টায় রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারীবর্ষণ হতে পারে। বর্ষণ অব্যাহত থাকলে সিলেট ও চট্টগ্রামের কোথাও কোথাও পাহাড় ধসের শংকা রয়েছে। আগামী কয়েকদিন বর্ষণ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা আছে বলেও জানানো হয়।

চসিকের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ভারী বৃষ্টির সাথে জোয়ারের পানি যোগ হওয়ায় পানি নামতে পারেনি। তবে ভাটা শুরু হলে পানি নেমে যাবে বলে দাবি করেছেন তারা।

গতকাল টানা বৃষ্টির সময় নগরীর জলাবদ্ধতা ও সড়কের বেহাল দশা নিয়ে ‘নগর ভবনে’ সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি জানান, সাম্প্রতিক বর্ষণে নগরীর সড়ক, অবকাঠামোসহ আনুমানিক ৫শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এরমধ্যে নগরীর অন্তত ২৫-৩০ শতাংশ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সড়কে পট-হোল মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে। বৃষ্টির মধ্যে ব্রিক সলিং ও খোয়া দ্বারা মেরামত করা হচ্ছে। অনুকূল আবহাওয়া ফিরে আসলে অ্যাসফল্ট প্ল্যান্ট দ্বারা কার্পেটিং করা হবে।

মেয়র জানান, সরকারি অর্থায়নে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাগুলোর উন্নয়ন, নালা-নর্দমা, ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণে ৭১৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা, বহদ্দারহাট বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত ৩২৭ কোটি টাকার খাল খনন প্রকল্প ও ২শ কোটি টাকায় আরেকটি নতুন অ্যাসফল্ট প্ল্যান স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। এসব কাজ সম্পন্ন হলে নগরীর জলাবদ্ধতা কমার পাশাপাশি সড়ক ব্যবস্থায় উন্নতি আসবে।

চলতি মৌসুমে বৃষ্টির কারণে এর আগেও কয়েক দফা তলিয়ে যায় বন্দর নগরী। এরমধ্যে নগরবাসীর অভিযোগের মুখে নগরীর দক্ষিণাংশের জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী করে গত ১৩ জুন বাঁধ অপসারণ করে সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে বাঁধ অপসারণের পরও জোয়ারের সময় বৃষ্টি হলে পানি নামতে না পারায় এসব এলাকার রাস্তায় পানি জমে যায়।

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি: সকাল থেকে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টির ফলে রাঙ্গামাটির ঘাগড়া, সাপছড়িসহ রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের বিভিন্নস্থানে পাহাড় ধস হয়েছে। রাঙ্গামাটির ধেপ্যাছড়ি এলাকায় বিশাল একটি পাহাড় ধসে রাঙ্গামাটি- চট্টগ্রাম সড়কের উপর পড়লে সড়ক বন্ধ হয়ে যায়। সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রায় তিন ঘন্টা চেষ্টা চালিয়ে রাস্তার উপর ধসে পড়া মাটির স্তূপ অপসারণ করে।

স্থানীয় সিএনজি চালকরা জানান, সকাল থেকে অতিবৃষ্টির ফলে রাঙ্গামাটি শহরের বিভিন্নস্থানে সড়কের উপর মাটি পড়ে এবং ধেপ্যাছড়ি এলাকায় বিশাল একটি পাহাড় ধসে পড়ে। তবে ঐ সময় কোনো যানবাহন সেখানে চলাচল করছিল না। রাঙ্গামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ আবু মুছা জানান, রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের বেশ কয়েকটি স্থানে পাহাড় ধস হয়েছে। মানিকছড়ির ধেপ্যাছড়ি এলাকায় বিশাল পাহাড় ধসে চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি সড়কের উপর পড়ে। ধসের ফলে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল।