রাজধানী ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কোথায়?

* বেশির ভাগ দাগি অপরাধী কলকাতায় পলাতক * টেলিফোনে চাঁদা তুলে আছেন আরাম-আয়েশে

শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কে কোথায়

শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কে কোথায়

ওয়ালি উল হাসনাত: টা অঙ্কের চাঁদা উঠছে দেশে। আর সেই চাঁদার টাকা বিদেশের মাটিতে খরচ করছেন দেশের পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। কেউ দামি ফ্ল্যাট কিনে, গাড়ি হাঁকিয়ে আয়েশি জীবনযাপন করছেন। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের রেড নোটিসের তালিকাভুক্ত এই সন্ত্রাসীদের অনেকেই আবার বিদেশে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক বনে গেছেন। বিদেশে থাকলেও চাঁদাবাজি ও দাপট একটুও কমেনি তাদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভয়ঙ্কর এই অপরাধীরা দেশে শুধু প্রকাশ্যে নেই, তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সবই চলছে ঠিক আগের মতোই। বিদেশে নিরাপদে থেকেই তারা নিয়ন্ত্রণ করছেন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাছে ঢাকা থেকে প্রতি মাসে চাঁদাবাজির কোটি কোটি টাকা যাচ্ছে বিদেশে। সহযোগীরা এ টাকা নানা মাধ্যমে পৌঁছে দিচ্ছে তাদের কাছে। কারও জন্য আবার স্বজনরাই চাঁদার টাকা নিয়ে ছুটছেন বিদেশে। এমন বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী এবং তাদের স্বজনদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণও এখন পুলিশের হাতে এসেছে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশের পলাতক সন্ত্রাসীদের অধিকাংশই ভারতে আত্মগোপন করে আছেন। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, সাড়ে তিন শ সন্ত্রাসী এখন ভারতের কলকাতা ও এর আশপাশ এলাকায় অবস্থান করছেন। তবে এদের মধ্যে পুরস্কার ঘোষিতসহ দুই ডজন শীর্ষ সন্ত্রাসী রয়েছেন, যাদের নামে ঢাকায় কয়েক কোটি টাকার চাঁদা উঠছে। গোয়েন্দাদের কাছে খবর রয়েছে, ভারতে অবস্থানকারী পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে অন্তত পাঁচজনের ব্যবসা রয়েছে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল ও দুবাইয়ে।
২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর চারদলীয় জোট সরকার ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নামের তালিকা প্রকাশ করে ধরিয়ে দিতে সাড়ে ১৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন গ্রেফতার এড়িয়ে পাশের দেশ ভারতে গিয়ে আত্মগোপন করেন। একটি গোয়েন্দা সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে হত্যাসহ ৩২টি মামলার পলাতক আসামি শাহজাহানপুরের জাফর আহমেদ মানিক, প্রকাশকুমার বিশ্বাস, দুটি হত্যাসহ তিনটি মামলার আসামি খন্দকার তানভিরুল ইসলাম জয়, ত্রিমতি সুব্রত বাইন ওরফে ফতলে লোহানি, ইমাম হোসেন, পুরান ঢাকার আগা সাদেক লেনের আগা শামীম, নাখালপাড়ার আবদুল জব্বার মুন্না কলকাতায় এবং হত্যাসহ ১০ মামলার আসামি মোল্লা মাসুদ রয়েছেন মুর্শিদাবাদে। জামিনে মুক্তি পেয়েই আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশকুমার বিশ্বাস কলকাতায় আশ্রয় নিয়েছেন। এ ছাড়া ১৬ মামলার আসামি মিরপুরের শাহাদাত হোসেন মুর্শিদাবাদে, নয় মামলার আসামি জিসান ওরফে নয়াটোলার জিসান কলকাতা ও দুবাইয়ে, ঢাকার শাহিন শিকদার আগরতলায়, তিনটি হত্যা মামলার আসামি গুলশানের মোস্তাফিজুর রহমার মুকুল ওরফে গ্রেনেড মুকুল ও ১০ মামলার আসামি কাফরুলের ইব্রাহিম খলিল, আগারগাঁওয়ের মিন্টু, মোহাম্মদপুরের সাবেক কমিশনার সাঈদ বেপারীর ছেলে শামীম রয়েছেন কলকাতায়। এ ছাড়া ঢাকার বাইরের ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীদের মধ্যে কুষ্টিয়ার আমিনুল ইসলাম মুকুল, শাহীন, আনোয়ার হোসেন আনু এবং কালু, যশোরের আনিসুর রহমান লিটন ওরফে ফিঙ্গে লিটন, রাজবাড়ীর হালিম, অমল কৃষ্ণ মণ্ডল, চট্টগ্রামের মামুনুর রশিদ মামুন, সুনিলকান্তি দে, নওগাঁর গৌতম চন্দ্র শীল ও চপল, মেহেরপুরের সিদ্দিক, চট্টগ্রামের মো. তৈয়ব, মোর্শেদ খান, নুরুল আলম ওরফে এতিম আলম, রাজীব দত্ত ওরফে রিঙ্কু এবং সাজ্জাদ খান, কুমিল্লার শহিদুল ইসলাম সাব্বা, ঝালকাঠির মোল্লা মাসুদ, মেহেরপুরের দুখু ও এনামুল হক এনাভাই রয়েছেন কলকাতাসহ বিভিন্ন এলাকায়। এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে হত্যাসহ অসংখ্য মামলা রয়েছে। সূত্র জানায়, ঢাকা ও চট্টগ্রামের পলাতক অপরাধীদের নামেই সবচেয়ে বেশি চাঁদা উঠছে। নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছেন তাদের সহযোগীরা। কলকাতার অপরাধী চক্রের সঙ্গেও এদের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। ত্রিমতি সুব্রত বাইন মুসলিম নাম ধারণ করে নেপাল ও ভারতে ব্যবসা করছেন। নেপাল ও কলকাতায় রয়েছে তার বিশাল বাহিনী। খন্দকার তানভিরুল ইসলাম জয়, আগা শামীম, আবদুল জব্বার মুন্নার ব্যবসা রয়েছে দুবাই, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে। গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, তারা জানতে পেরেছেন পলাতক এই সন্ত্রাসীদের কয়েকজন এরই মধ্যে ভারতীয় ভোটার আইডি কার্ড, পাসপোর্ট, রেশনকার্ড, ফ্ল্যাট বা ব্যবসা-বাণিজ্যের মালিকানা, একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টসহ বিভিন্ন ডকুমেন্ট সংগ্রহ করেছেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, এদের অনেকেই কলকাতা, যাদবপুর, সল্ট লেকে ফ্ল্যাটের মালিক। ভারতীয়দের সঙ্গে তারা বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িয়ে আছেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গেও রয়েছে তাদের গভীর যোগাযোগ। সূত্র জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের জন্য প্রতি মাসে ২ কোটি টাকা যাচ্ছে এ দেশ থেকে। শাহাদাত বেশির ভাগ সময় ভারতেই অবস্থান করেন বলে গোয়েন্দাদের কাছে খবর রয়েছে। মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, শাহআলী, দারুসসালামসহ আশপাশ এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে নিয়মিত টাকা ওঠানো হচ্ছে। প্রকাশ ও বিকাশের নামে ঢাকাজুড়েই চাঁদাবাজি চলছে। এ ছাড়া বিকাশ মিরপুরের সরকারি প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছেন কলকাতায় থেকেই। সূত্র জানায়, শহিদ কমিশনার অস্ত্রসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর তার অনুসারীদের বেশ কয়েকজন ওইদিনই দেশ ছেড়ে পালান। ওই সন্ত্রাসীদের নামেও এখন চাঁদাবাজি চলছে। আদাবর শ্যামলী এলাকার সন্ত্রাসী নবীর নামে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় হচ্ছে রাজধানীর পশ্চিম জোন থেকে। অনেকে সরাসরি তাকে ভারতে টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছেন বলে জানা যায়। মোহাম্মদপুরে আলোচিত বরকত হত্যা মামলার আসামি শামীমের নামে ওই এলাকায় চাঁদা তুলছেন নবীনগরের গালকাটা মোশারফ। গোয়েন্দা পুলিশের সূত্র জানায়, যেসব সন্ত্রাসী বিভিন্ন দেশে পলাতক রয়েছেন তাদের আত্মীয়স্বজনদের অনেকে চাঁদার টাকা আদায় এবং তা প্রবাসে পাঠানোর কাজ করছেন। সন্ত্রাসীদের আত্মীয়স্বজনদের অ্যাকাউন্টে জমা হচ্ছে চাঁদার টাকা। সূত্র জানায়, রাজধানীর ৩২ মামলার আসামি তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহমেদ মানিকের সহযোগীরা ঢাকায় চাঁদার জন্য একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলিয়ে দেন। তার নামে যে চাঁদা আদায় হয় তার বেশির ভাগ জমা হচ্ছে তার পরিবারের সদস্যদের অ্যাকাউন্টে। ওই অ্যাকাউন্ট থেকেই পরে তা ট্রান্সফার করা হয় মানিকের নামে। ওইসব অ্যাকাউন্টে ২ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা জমা হওয়ার প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন গোয়েন্দারা।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, স্বজনদের মাধ্যমে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাছে প্রবাসে অর্থ পৌঁছে যাচ্ছে এমন তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। অর্থ পাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ইউনিটগুলো সক্রিয় রয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদাবাজি হচ্ছে। হালে বিকাশের নামেই বেশি অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তাদের কাছে বিভিন্নভাবে চাঁদার টাকা পাঠানো হয়। সেগুলো ধরতে গোয়েন্দা পুলিশের তৎপরতা রয়েছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের নাম ব্যবহারও হয় বলে তিনি দাবি করেন।