শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অপূর্ব লীলাভূমি বগুড়া :: (উপ-সম্পাদকীয়)

বাংলাদেশের তিহ্যমন্ডিত একটি জেলার নাম বগুড়া। বাংলার প্রাচীন রাজধানী পুন্ড্রুবর্ধন এ অঞ্চলটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। ইতিহাস-খ্যাত প্রাচীন পুন্ড্রু জনপদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বগুড়া অঞ্চলের মানুষকে দিয়েছে গৌরবোজ্জ্বল সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। পুন্ড্রু জনপদের পুন্ড্ররা ছিল শৌর্য্য-বির্য্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, কৈবর্ত, মুসলিমসহ পরবর্তী শাসকদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে উদার পৃষ্ঠপোষকতায়  পুন্ড্র অধিবাসীদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল বিশেষত্ব।

ফকির আন্দোলনখ্যাত ফকির মজনু শাহ মস্তানার পুন্ড্রুবর্ধনকেন্দ্রিক ফকির-সন্যাসী আন্দোলন, পুন্ড্রু মাটির সন্তান বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীর বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা, বৃটিশবিরোধী আন্দোলন, এই জনপদের সন্তান ভাষা সৈনিক গাজিউল হকের  প্রাণের ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষায় মর্যাদাদানের আন্দোলনে নেতৃত্বদান, মহান মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য পুন্ড্রবাসীর আত্মত্যাগ এবং ওই সকল আন্দোলনে মুক্তিপাগল সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও জীবনদান এ অঞ্চলের মানুষকে দিয়েছে বিশেষ বোধ ও চেতনা। সেই চেতনায় বিকশিত উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির পাদপীঠ পুন্ড্রবর্ধন তথা বগুড়া অঞ্চল কাল কালান্তরে সংস্কৃতিচর্চায় পথনির্দেশ করেছে এ জনপদের মানুষদের।ইতিহাসখ্যাত পুন্ড্রবর্ধনে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় ভাসুবিহার, দ্বন্দ্ব মন্দিরে নাট্যশালা, চর্যাপদ লেখার স্থান জগীর ভবন এ অঞ্চলের উন্নত সংস্কৃতিরই পরিচায়ক।

এ পুন্ড্রবর্ধনেই দেবনর্তকী কমলার নৃত্যে মোহিত হয়েছিলেন কাশ্মীর রাজ জয়াপীড়। ধারণা করা হয় দেবনর্তকী কমলাই এ অঞ্চলের প্রথম নৃত্যশিল্পী এবং অভিনেত্রী আর অষ্টম শতাব্দীর দ্বন্দ্ব মন্দিরের নাট্যশালাই বগুড়া তথা বাংলাদেশের প্রথম নাটমঞ্চ। জীবন মৈত্রের পদ্মপুরান কাব্য, অদ্ভুতাচার্যের রামায়ন কাব্য প্রভৃতি সঙ্গীত ও নৃত্যাশ্রয়ী নাটক ও কাব্য পুন্ড্র জনপদের মানুষের সাংস্কৃতিক সত্বাকে করেছে বিকশিত। বিকাশের সে ধারায় সমৃদ্ধ হয়েছে অধুনা বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বগুড়া জেলা।
করতোয়া, যমুনা, বাঙালি, ইছামতি প্লাবিত সংগ্রামী মানুষের জীবন এ অঞ্চলের চিরায়ত সংস্কৃতির অংশ। নিজস্ব ধারার ছড়া, লোকগাঁথা, নাচ, গান ও বিভিন্ন লোকজ খেলাধুলায় স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ সংগ্রামী এ জনপদের মানুষকে দিয়েছে একটি নিজস্ব সাংস্কৃতিক বলয়। নৃত্য, সঙ্গীত ও নাট্যচর্চায় জেলাটি এখন গোটা বাংলাদেশে বিশেষ আসনে আসীন রয়েছে।

১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এডওয়ার্ড ঘূর্ণায়মান মঞ্চ ও এডওয়ার্ড ড্রামেটিক এ্যাসোসিয়েশন বগুড়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি মাইলফলক হয়ে আছে। এ মঞ্চে নিয়মিত নাটক মঞ্চস্থ হত। নাট্যচর্চার এ ধারাবাহিকতায় চলন্তিকা নাট্যগোষ্ঠী, শুকতারা ক্লাব, শিববাটি সেবক সমিতি আজিজুল হক কলেজ ছাত্র সংসদ, প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন, বগুড়া নাট্যগোষ্ঠী, গ্রাম থিয়েটারভূক্ত বগুড়া থিয়েটার, সংশপ্তক থিয়েটার, বগুড়া নাট্যদল, করতোয়া নাট্যগোষ্ঠী, নান্দনিক নাট্যদল, কলেজ থিয়েটার-বগুড়া, অনুশীলন ৯৫, পদাতিক, শিশু সংগঠন নতুন বাংলা খেলাঘর আসর, লিটল থিয়েটার, ভোর হলো, উচ্চারণ একাডেমী, থিয়েটার এ্যম্বিশন, গণ উন্নয়ন গ্রন্থাগার, অ আ ক খ, রোড থিয়েটার, কাহালু থিয়েটার, সোনাতলা থিয়েটার, গোলাবাড়ী থিয়েটার গাবতলী, প্রভাতী থিয়েটার, পাঁচপীর, কাহালু, ধুনট থিয়েটার, যমুনা থিয়েটার, সারিয়াকান্দী, কলেজ থিয়েটার, বগুড়া, থিয়েটার আইডিয়া ,বগুড়াসহ আরও বেশ কয়েকটি নাট্য সংগঠন বগুড়ার নাট্যাঙ্গনকে সজিব রেখেছে।ভাষা আন্দোলনভিত্তিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন সারাদেশের মতো বগুড়াতেও প্রভাব ফেলেছিল। বিভিন্ন মঞ্চে গান গেয়ে উদ্দীপনা সৃষ্টির মাধ্যমে বগুড়ার শিল্পীরা সে আন্দোলনকে বেগবান করেছে। বগুড়ার অসংখ্য গুণী সঙ্গীত শিল্পীর পদচারণায় মুখরিত ছিল এবং আছে সারা বাংলাদেশ। জাতীয় পর্যায়েও তাঁদের পদচারণা আশাব্যঞ্জক। বগুড়ার আঞ্চলিক গানকে সারাদেশে জনপ্রিয় করেছে বগুড়া  ইয়্যুথ কয়্যার।

জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ-বগুড়া, জাতীয় কবিতা পরিষদ-বগুড়া জেলা শাখা, বগুড়া পল্লীগীতি পরিষদ, নবগীতি সঙ্গীত একাডেমী, নাগানা শিল্পী গোষ্ঠী, গীতিচর্চা সঙ্গীতালয়, সুরছন্দ একাডেমী, নজরুল পরিষদ, বগুড়া, সুরের ছোয়া সঙ্গীত একাডেমী, বাউল গোষ্ঠী, অনুশীলন ৯৫ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী-বগুড়া, মৌমাছি খেলাঘর, নন্দন শিল্পী গোষ্ঠী, রক্তটিকা খেলাঘর আসর শেরপুর, সপ্তস্বর শিল্পী গোষ্ঠী, আনন্দকণ্ঠ, দৃষ্টি-বগুড়া, শুদ্ধস্বর-বগুড়া, প্রকাশ শৈলী, শেরপুর সাংস্কৃতিক একাডেমী, গীতিচর্চা সঙ্গীতালয়, সুরছন্দ একাডেমী, স্বপ্নচূঁড়া শিল্পী গোষ্ঠী, নবগীতি সঙ্গীত একাডেমীসহ আরও বেশ কয়েকটি সংগঠনের প্রাণবন্ত পদচারণায় মুখরিত বগুড়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গন।বগুড়ার নৃত্যশিল্পীরা নৃত্যকলার মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বগুড়াকে পরিচিত করেছে। তাদের সরব পদচারনায় সমৃদ্ধ হচ্ছে বগুড়ার সংস্কৃতি। এ ধারায় অগ্রগণ্য আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠী, ক্রিয়েটিভ কালচারাল একাডেমী, বুলবুল নৃত্যকলা কেন্দ্র,নৃত্যছন্দম আর্টস একাডেমী, মৌসুমী নৃত্যাশ্রম, নৃত্য মন্দির পারফর্মিং আর্টস্ একাডেমী।

কবি আর্য্যক্ষেমীশ্বর, জীবন মৈত্র, অদ্ভুতাচার্য, প্রভাস চন্দ্র সেন, কবি রোস্তম আলী কর্ণপুরী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মোস্তফা নূর উল ইসলাম, এম আর আখতার মুকুল,রোমেনা আফাজ, হরগোপাল দাস কুন্ডুর দেখানো পথ বগুড়ার সাহিত্য ভান্ডারকে করেছে সমৃদ্ধ, সংস্কৃতিতে দিয়েছে নতুন ধারা। সে ধারাকে শানিত করছে বগুড়া লেখক চক্র, স্বজন পাঠচক্র, চকসুত্রাপুর লেখক আসর, শেরপুর সাহিত্য চক্র, দুর্জয় সাহিত্য গোষ্ঠী- সোনাতলাসহ আরও বেশ কয়েকটি সংগঠন।

সংবাদপত্রের জেলা বগুড়া। বগুড়া শহর থেকে ২০টির অধিক দৈনিক পত্রিকা ও বেশ কয়েকটি সাপ্তাহিক পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। জেলার কয়েকটি উপজেলা থেকেও প্রকাশিত হচ্ছে সাপ্তাহিক কয়েকটি পত্রিকা। এছাড়াও এ জেলা থেকে প্রকাশিত হচ্ছে অনেকগুলো লিটল ম্যাগাজিন। জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ জেলা সদর থেকে বেশ কয়েকটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল সগর্বে পদচারণা করছে।

বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষা, বগুড়ার নিজস্ব গীত, লোকগাঁথা, দেশবিখ্যাত দই, ঝাঁঝাল মরিচ, ফাউন্ড্রী শিল্পসহ উদীয়মান শিল্প বগুড়ার সংস্কৃতিতে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করেছে। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অপূর্ব লীলাভূমি পুন্ড্রু নগরী তথা বগুড়া রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে যেমন আরও সমৃদ্ধ করতে পারবে তেমনি সমৃদ্ধির সে ধারায় আলোকিত হবে গোটা দেশ।