
শিক্ষা ও নৈতিকতার পবিত্র আঙিনায় আবারও এক চরম সামাজিক অবক্ষয় ও শিক্ষকতার মর্যাদাকে কালিমালিপ্ত করার মতো ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে। নিজের কলেজেরই দ্বাদশ শ্রেণির এক অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রীকে ফুসলিয়ে নিয়ে দীর্ঘ ২৬ দিন ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আত্মগোপনে থাকার পর, অবশেষে পুলিশের জালে আটকা পড়েছেন অভিযুক্ত কলেজ শিক্ষক মো. রবিউল আলম। তথ্যপ্রযুক্তির সুনিপুণ ব্যবহার ও আধুনিক গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে গত রোববার (৩১ মে) গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ এলাকার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে নিখোঁজ ওই তরুণীকে উদ্ধারসহ অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। এই ঘটনাটি শুধু একটি অপহরণ বা নিখোঁজের গল্প নয়, বরং এটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যকার বিশ্বাস ও নৈতিক সম্পর্কের চরম স্খলনকে মনে করিয়ে দেয়।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৫ মে, যখন রায়গঞ্জ উপজেলার ব্রহ্মগাছা গ্রামের পলি কুমারী ভৌমিক (১৭) নামের ওই কলেজছাত্রী সন্ধ্যাবেলা বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি। সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজেও মেয়ের হদিস না পেয়ে পরদিন রায়গঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তার অসহায় মা বেলি রানী ভৌমিক। তবে পরিবারের নিখাদ সন্দেহের তির শুরু থেকেই ছিল রায়গঞ্জ উপজেলা সদর মহিলা কলেজের শিক্ষক মো. রবিউল আলমের (৪৩) দিকে। বিবাহিত ও প্রবীণ এই শিক্ষক তরুণীটিকে বিয়ের প্রলোভন কিংবা অন্য কোনো ফাঁদে ফেলে ফুসলিয়ে ঘরছাড়া করেছিলেন—এমন অভিযোগই ছিল পরিবারের। একজন শিক্ষক যেখানে শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও পথপ্রদর্শক হওয়ার কথা, সেখানে দ্বাদশ শ্রেণির এক ছাত্রীর সাথে এমন আচরণ স্থানীয় সচেতন সমাজ ও পলিদের পরিবারে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল এই স্পর্শকাতর মামলাটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মাঠে নামে। অভিযুক্ত শিক্ষক অত্যন্ত চতুরতার সাথে বারবার অবস্থান পরিবর্তন করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট, মোবাইল ট্র্যাকিং এবং কাটাবাড়ী এলাকার স্থানীয় তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, আসামির অবস্থান এখন গাইবান্ধায়। এরপরই সেখানে চালানো হয় এক অতর্কিত ঝটিকা অভিযান, যার ফলে উদ্ধার হয় দীর্ঘ দিন অবরুদ্ধ থাকা ওই শিক্ষার্থী এবং গ্রেফতার হন শিক্ষক রবিউল।
বর্তমানে ওই ছাত্রীকে প্রয়োজনীয় ডাক্তারি পরীক্ষা ও আইনি জবানবন্দি গ্রহণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে, অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কঠোর ধারায় নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে। গতকাল সোমবার তাকে সিরাজগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে বিজ্ঞ বিচারক তার সামাজিক অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে জামিন আবেদন তাৎক্ষণিকভাবে নামঞ্জুর করেন এবং তাকে সরাসরি জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। রায়গঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহসানুজ্জামান জানিয়েছেন, ঘটনার নেপথ্যে কোনো মানসিক ব্ল্যাকমেইল বা অন্য কোনো অপরাধ লুকায়িত আছে কি না, তা ডিজিটাল উপাত্ত বিশ্লেষণ করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং দ্রুততম সময়ে আদালতে এর চূড়ান্ত চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।